১৯২০-এর দশকের শুরুর দিকে জার্মানি ছিল অর্থনৈতিক সংকট, মুদ্রাস্ফীতি আর যুদ্ধ-পরবর্তী অস্থিরতায় জর্জরিত। এমন সময়ে বাভারিয়ার গ্রামাঞ্চলে অবস্থিত একটি ছোট, নির্জন খামারবাড়ি — হিন্টারকাইফেক — হঠাৎ করে বিশ্বের সবচেয়ে কুখ্যাত অপরাধের স্থানে পরিণত হয়।
খামারবাড়ি ও পরিবার
হিন্টারকাইফেক ছিল মিউনিখ থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার উত্তরে ওয়াইডহোফেনের কাছে কাইফেক গ্রামের একটি প্রত্যন্ত খামার। “হিন্টার” শব্দের অর্থ “পেছনে” বা “আড়ালে” — নামটিই বলে দেয় এটি কতটা বিচ্ছিন্ন ছিল।
খামারের বাসিন্দা ছিলেন গ্রুবার পরিবার:
- আন্দ্রেয়াস গ্রুবার (৬৩) — কঠোর, একগুঁয়ে খামারের কর্তা
- তাঁর স্ত্রী ক্যাজিলিয়া গ্রুবার (৭২)
- তাঁদের বিধবা মেয়ে ভিক্টোরিয়া গ্যাব্রিয়েল (৩৫)
- ভিক্টোরিয়ার দুই সন্তান — ক্যাজিলিয়া (৭) ও জোসেফ (২ বছর)
- নতুন চাকরানি মারিয়া বাউমগার্টনার (৪৪) — যিনি ঘটনার দিনই প্রথম কাজে যোগ দিয়েছিলেন
ঘটনার কয়েক সপ্তাহ আগের অদ্ভুত ঘটনা
হত্যাকাণ্ডের আগে থেকেই খামারে অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটছিল:
- পূর্বের চাকরানি হঠাৎ চাকরি ছেড়ে চলে যান — কারণ তিনি রাতে ছাদে , পায়ের আওয়াজ, অদ্ভুত শব্দ শুনতেন এবং বলতেন বাড়িটা “ভূতুড়ে”।
- আন্দ্রেয়াস গ্রুবার দাবি করেন যে খামারের পায়খানায় কারও পায়ের ছাপ দেখেছেন যা তার পরিবারের কারও নয়।
- সাম্প্রতিক সময়ে খাবার ও খড়ের পরিমাণ অদ্ভুতভাবে কমে যাচ্ছিল — যেন কেউ লুকিয়ে খামারে থাকছে।
- একদিন আন্দ্রেয়াসের একটি ম্যাটক (mattock — কুড়ালের মতো কিন্তু একপাশে পিক) হারিয়ে যায়।
হত্যাকাণ্ডের দিন: ৩১ মার্চ ১৯২২
৩১ মার্চ বিকেলে নতুন চাকরানি মারিয়া বাউমগার্টনার তার বোন ফ্রানজিস্কার সাথে খামারে পৌঁছান। এটাই ছিল তার প্রথম ও শেষ দিন।
সম্ভবত সন্ধ্যার দিকে খুনি পরিবারের সদস্যদের একে একে বার্নে (খড়ের গোলা/গোয়ালঘর) ডেকে নিয়ে যায়। সেখানে তাদেরকে ম্যাটক দিয়ে মাথায় আঘাত করে হত্যা করা হয়।
- বার্নে পাওয়া যায়: আন্দ্রেয়াস, ক্যাজিলিয়া (বৃদ্ধা), ভিক্টোরিয়া এবং ছোট ক্যাজিলিয়ার মৃতদেহ — খড় দিয়ে ঢাকা।
- বাড়ির ভেতর: ২ বছরের জোসেফ তার বিছানায় এবং মারিয়া বাউমগার্টনার (সম্ভবত ঘুমের মধ্যে) খুন হন।
অটোপ্সি রিপোর্টে (ডা. যোহান ব্যাপটিস্ট আউমুলার) দেখা যায়:
- বেশিরভাগের মাথার খুলি চূর্ণ-বিচূর্ণ
- ছোট ক্যাজিলিয়া (৭) সম্ভবত কয়েক ঘণ্টা বেঁচে ছিল — তার হাতে নিজের চুলের গোছা পাওয়া যায়
- আঘাতগুলো খুবই শক্তিশালী ও নির্ভুল ছিল
আবিষ্কার ও তদন্তের শুরু: ৪ এপ্রিল ১৯২২
প্রতিবেশীরা যখন দেখল খামার থেকে কোনো ধোঁয়া উঠছে না, কেউ বাইরে আসছে না — তখন তারা খোঁজ নিতে যায়। ৪ এপ্রিল বিকেলে মৃতদেহগুলো আবিষ্কৃত হয়।
অদ্ভুত ও ভয়ংকর কিছু প্রমাণ:
- খুনির পায়ের ছাপ বাড়ির দিকে গেছে, কিন্তু ফিরে আসার কোনো ছাপ নেই।
- খুনের পর কয়েকদিন খামারে আগুন জ্বালানো হয়েছে, খাবার খাওয়া হয়েছে, গরু দুধ দেওয়া হয়েছে।
- খুনি সম্ভবত হত্যার পর কয়েকদিন খামারে লুকিয়ে ছিল বা থেকেছে।
- হত্যার অস্ত্র (ম্যাটক) পরে বার্নের ছাদের খড়ের মধ্যে পাওয়া যায়।
সন্দেহভাজন ও তত্ত্বসমূহ
পুলিশ শতাধিক মানুষকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। কিছু উল্লেখযোগ্য সন্দেহভাজন ও তত্ত্ব:
- লরেঞ্জ শ্লিটেনবাউয়ার (প্রতিবেশী) — সবচেয়ে বেশি সন্দেহের মুখে পড়েন। তিনি ভিক্টোরিয়ার সাথে সম্পর্কের গুজব ছিল। ছোট জোসেফের বাবা হিসেবেও তাঁকে সন্দেহ করা হয় (ইনসেস্টের অভিযোগও ছিল পরিবারে)।
- পরিবারের অভ্যন্তরীণ ঘৃণা — আন্দ্রেয়াসের সাথে ভিক্টোরিয়ার সম্পর্ক নিয়ে গুজব (কিছু রিপোর্টে বলা হয় আন্দ্রেয়াস নিজের মেয়ের সাথে অস্বাভাবিক সম্পর্কে জড়িত ছিলেন)।
- বাইরের কোনো মানুষ — সম্ভবত ভবঘুরে বা প্রতিশোধপরায়ণ কেউ।
- আত্মহত্যা-সদৃশ হত্যা — কিন্তু এই তত্ত্ব প্রমাণিত হয়নি।
কেন এখনো অমীমাংসিত?
- ১৯২২ সালের ফরেনসিক সুবিধা খুবই সীমিত ছিল (ডিএনএ, ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংরক্ষণের ব্যবস্থা ছিল না)।
- মাথার খুলিগুলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হারিয়ে যায়।
- ১৯৫৫ সালে কেসটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করা হয়। সর্বশেষ জিজ্ঞাসাবাদ হয় ১৯৮৬ সালে।
উপসংহার
হিন্টারকাইফেক হত্যাকাণ্ড শুধু একটি খুনের ঘটনা নয় — এটি একটি ভয়াবহ রহস্য যা মানুষের মনে গভীর প্রশ্ন জাগায়: একজন মানুষ কীভাবে এত নির্মম হতে পারে? কেন খুনি লাশগুলো ঢেকে রেখেছিল? কেন সে কয়েকদিন খামারে থেকেছিল? এবং সবচেয়ে বড় প্রশ্ন — সে কে ছিল?
আজও বাভারিয়ার সেই জায়গায় একটি ছোট স্মৃতিস্তম্ভ দাঁড়িয়ে আছে। খামারটি ভেঙে ফেলা হয়েছে, কিন্তু রহস্যটা এখনো বেঁচে আছে।
.jpg)
0 Comments