ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান (The Hanging Gardens of Babylon)

ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান পৃথিবীর সাতটি প্রাচীন আশ্চর্যের (Seven Wonders of the Ancient World) একটি হিসেবে পরিচিত। এটি ইতিহাসের সবচেয়ে রহস্যময় আলোচিত স্থাপনাগুলোর মধ্যে অন্যতম। আশ্চর্যের বিষয় হলোএটির অস্তিত্ব নিয়ে আজও ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।


অবস্থান সময়কাল

ঝুলন্ত উদ্যানটি বর্তমান ইরাকের ব্যাবিলন নগরীতে অবস্থিত ছিল বলে ধারণা করা হয়। এটি নির্মিত হয়েছিল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ শতকে

গ্রিক ঐতিহাসিকদের বর্ণনা অনুযায়ী, ব্যাবিলনের রাজা নেবুচাদনেজার দ্বিতীয় (Nebuchadnezzar II) এই উদ্যানটি নির্মাণ করেছিলেন।


নির্মাণের উদ্দেশ্য

জনশ্রুতি অনুযায়ী, রাজা নেবুচাদনেজার তাঁর স্ত্রী রানি আমিটিস (Queen Amytis)-এর জন্য এই উদ্যান নির্মাণ করেন।
রানি আমিটিস ছিলেন পাহাড়ঘেরা সবুজ অঞ্চলের (মিডিয়া) রাজকন্যা। ব্যাবিলনের শুষ্ক মরুভূমিময় পরিবেশে তিনি বিষণ্ন হয়ে পড়েন। তাঁর মন খুশি করতেই রাজা এই কৃত্রিম পাহাড়সদৃশ সবুজ উদ্যান তৈরি করেন।


কেনঝুলন্তবলা হয়?

এই উদ্যান প্রকৃতপক্ষে দড়িতে ঝুলে ছিল না।
এটি তৈরি করা হয়েছিল ধাপে ধাপে উঁচু ছাদ স্তরের ওপর, যেখানে গাছপালা নিচের দিকে ঝুলে পড়ত। দূর থেকে দেখলে মনে হতো গাছগুলো বাতাসে ঝুলে আছেএই কারণেই নাম হয় “Hanging Gardens”


গঠন স্থাপত্য কৌশল

ঝুলন্ত উদ্যানের স্থাপত্য ছিল যুগান্তকারী

  • একাধিক সোপান বা টেরেস
  • পাথর ইট দিয়ে তৈরি শক্ত ভিত্তি
  • উপরের স্তরে বড় বড় গাছ ফলজ উদ্ভিদ
  • মাটির নিচে জলরোধী স্তর (bitumen সীসা)

সবচেয়ে বিস্ময়কর ছিল সেচব্যবস্থা


উন্নত সেচ ব্যবস্থা

ইউফ্রেটিস নদী থেকে পানি তুলে উপরের স্তরে পৌঁছানোর জন্য ব্যবহৃত হতো

  • চেইন পাম্প বা স্ক্রু-জাতীয় যন্ত্র
  • দাস বা যান্ত্রিক ব্যবস্থায় চালিত পানি উত্তোলন পদ্ধতি

এই প্রযুক্তি সেই সময়ের জন্য ছিল অত্যন্ত উন্নত।


রহস্য বিতর্ক

আজ পর্যন্ত ব্যাবিলনে ঝুলন্ত উদ্যানের নির্দিষ্ট প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এই কারণে কিছু ইতিহাসবিদ মনে করেন

  • এটি হয়তো বাস্তবে ছিল না
  • অথবা এটি ব্যাবিলনে নয়, নিনেভেহ (Nineveh) নগরীতে ছিল
  • কিংবা এটি সাহিত্যিক কল্পনা অতিরঞ্জনের ফল

তবে গ্রিক লেখক হেরোডোটাস, স্ট্র্যাবো ডায়োডোরাস-এর বর্ণনা একে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।


ধ্বংসের কারণ

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে

  • ভূমিকম্প
  • অবহেলা
  • রাজনৈতিক পরিবর্তন

এই উদ্যান ধ্বংস হয়ে যায় বলে ধারণা করা হয়। খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দীর পর আর এর উল্লেখ তেমন পাওয়া যায় না।


ঐতিহাসিক গুরুত্ব

ঝুলন্ত উদ্যান মানব সভ্যতার

  • প্রকৌশল দক্ষতা
  • প্রকৃতিপ্রেম
  • নান্দনিক ভাবনা

প্রতিফলন করে। এটি প্রমাণ করে, প্রাচীন মানুষ কেবল যুদ্ধ নয়সৌন্দর্য ভালোবাসার জন্যও স্থাপনা নির্মাণ করত


উপসংহার

ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান আজও এক রহস্য। এটি সত্যিই ছিল নাকি কেবল কিংবদন্তিতা নিশ্চিতভাবে বলা না গেলেও, ইতিহাস কল্পনার মেলবন্ধনে এটি মানব সভ্যতার সবচেয়ে সুন্দর কাহিনিগুলোর একটি হয়ে আছে।


 

Post a Comment

0 Comments