রোহিঙ্গা সংকটের পটভূমি: রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের সীমানার নিকটবর্তী রাখাইন (আদৃষ্টে আরাকান) প্রদেশের বাসিন্দা মুসলিম সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী। দীর্ঘদিন ধরে তারা বৈধ নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত, সহিংসতার শিকার। ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে রাখাইনে মিলিটারির “পরিষ্কার অভিযান”–এর পর মাত্র কয়েক সপ্তাহে এক লাখের বেশি গ্রাম ছাড়া হয়ে যায়, শত শত রোহিঙ্গা খুন হন এবং সহস্রাধিক নারী-শিশু ধর্ষণের শিকার হন। এর পরপরই সেনা ও উগ্র সংগঠন গ্রামগুলোতে তান্ডব চালায়; সেই হামলা থেকে বাঁচতে আগস্ট–ডিসেম্বর ২০১৭-এ ৭৫০,০০০ জনেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়unhcr.orgthenewhumanitarian.org। এর আগে ১৯৯০-এর দশকে ও ২০০০-২০১২ সালের মধ্যে রাখাইনের উপকূলবর্তী অবৈধ রোহিঙ্গা শিবিরে বাংলাদেশে আগমন ছিল। বর্তমানে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা ১ মিলিয়নের উপরে, প্রধানত কক্সবাজারের অতিদরিদ্র শিবিরগুলোতে আবদ্ধ (১,০০৬,০০০ জন নিবন্ধিত)unhcr.orgdata.unhcr.org। এর ফলে স্থানীয় হোস্ট কমিউনিটির ওপর চাহিদা ও ভোগান্তির মাত্রা অত্যন্ত বেড়ে গেছে।
সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘন: রাখাইনে নিরাপত্তা বাহিনীর নিপীড়ন চালনার নেতৃত্বে ছিল মিয়ানমার সেনাবাহিনী। জাতিসংঘের সত্যা-তদন্তকারী মিশন উল্লেখ করেছে, ২০১৭ সালের বিস্তৃত অভিযান “অবশ্যই আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী নৃশংসতম অপরাধ” এবং ‘জাতি সাফাই’ এর শামিলthenewhumanitarian.org। তৎকালীন এনজিওদের হিসেবে কমপক্ষে ৬,৭০০ জন রোহিঙ্গাকে শুধু কয়েকদিনে হত্যা করা হয়thenewhumanitarian.org। গ্রাম আগুনে পুড়িয়ে দেয়া, নিরীহ মানুষদের গুলি করার তথ্য ইত্যাদি সবই নির্মম অনুশীলন ছিল। ইউএইচসি (Human Rights Office)–এ তদন্ত প্রতিবেদনে এসব কাজ “গ্রাম নিধন, গণহত্যা” আখ্যা পায়thenewhumanitarian.org। এই সহিংসতার ফলে রোহিঙ্গারা ভীত হয়ে পালিয়ে আসে, শত শত হাজার জীবন বাজি রেখে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া: এই গণহত্যামূলক অভিযান বিশ্বমঞ্চে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। জাতিসংঘের বিভিন্ন খাতের নেতারা বর্বরতার সমালোচনা করে এবং মিয়ানমার সেনাপ্রধানসহ
অন্যন্যদের জবাবদিহি করার জন্যে ডাক দেন। ২০১৯ সালে গাম্বিয়া রাষ্ট্রের পক্ষে আইসিজিতে মামলা দায়ের করে বলা হয় এই ঘটনায় ‘জাতিসংহার বা গ্রাম নিধন’ চলছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রভৃতি দেশ মিয়ানমারের ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। thenewhumanitarian.org। ওআইসি (OIC)ও তীব্র প্রতিবাদ প্রকাশ করে, এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদেও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যা তদন্তের আহ্বান জানানো হয়। এসব আন্তর্জাতিক চাপ সত্ত্বেও রাখাইনে মানবাধিকার পরিস্থিতি দুর্বল এবং রোহিঙ্গা নির্যাতন থামে নি। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয় এবং রাখাইনের অভ্যন্তরে বিদ্রোহী ‘আরাকান আর্মি’ ও জান্তার সংঘাত ঊর্ধ্বগামী হয়েছে।
জাতিসংঘ ও অন্যান্য সংস্থার মানবিক সহায়তা কর্মসূচি
রোহিঙ্গা শিবিরগুলিতে জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ব্যাপক সহায়তা প্রদান করছে। UNHCR (জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা), WFP (বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি), IOM (আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা), UNICEF সহ প্রায় ১২০টিরও বেশি অংশীদার সংস্থা ২০১৭ সাল থেকে ক্যাম্পে খাদ্য, ত্রাণ, চিকিৎসা, শিক্ষা, জলের ব্যবস্থা ও সুরক্ষা দেয়। সম্পূর্ণ শিবিরবাসীই মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল: জাতিসংঘ বলেছে রোহিঙ্গারা “সম্পূর্ণ মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল”unhcr.org। বাংলাদেশ সরকারও তাদের তত্ত্বাবধানে এই উদ্যোগগুলো সমন্বয় করেছে। ২০২৫-২৬ সালের যৌথ তহবিল আহ্বানে (JRP) বাংলাদেশ সরকারের নেতৃত্বে ১,৪৮ লাখ জনের (রোহিঙ্গা ও হোস্ট কমিউনিটি) সহায়তার জন্য ৯৩৪.৫ মিলিয়ন ডলার চাওয়া হয়েছেunhcr.org।
তবে তহবিল সংকট চলছে। আন্তর্জাতিক দাতা ও মিডিয়া অনুযায়ী পর্যাপ্ত অর্থ না আসায় দুর্ভিক্ষের অ্যান্টসি তৈরি হচ্ছে। ২০২৫ সালের মার্চে আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, খাদ্য তহবিল সংকটে WFP প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গার খাদ্যভাতা ১২.৫০ ডলার থেকে ৬ ডলার করতে বাধ্য হচ্ছে aljazeera.com। বাংলাদেশের শরণার্থী তত্ত্বাবধায়কও নিশ্চিত করেছেন ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে রেশন হ্রাস পাবে, যা “এখনকার অবস্থা ইতোমধ্যেই অপ্রতুল, নতুন কাটছাঁট ভয়াবহ ফল ডেকে আনতে পারে”aljazeera.com। অর্থনৈতিক সংকটে WHO, UNICEF–সহ অন্যান্য সংস্থাও সংস্থাগুলোকে চিকিৎসা, শিশু সুরক্ষা ও শিক্ষা চালিয়ে যেতে অপর্যাপ্ত তহবিলের আশঙ্কা করছে। এই অবস্থায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার বাজেটে অবিলম্বে অর্থ বৃদ্ধি এবং স্থায়ী সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে unhcr.orgaljazeera.com।
মানবিক করিডোর: ধারণা ও প্রয়োজনীয়তা
দর্শন: ‘মানবিক করিডোর’ হল এমন এক সাময়িক নিরাপত্তামণ্ডিত পথ বা জোন যা এক সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে সংকটাপন্ন মানুষের প্রতি ত্রাণ পৌছে দিতে অথবা তাঁদের নিরাপদ সরিয়ে নিতে ব্যবহৃত হয়en.wikipedia.org। এই পথে বন্দুকবিরতি বা কোনো বাহিনী প্রবেশের অনুমতি হয় না এবং একরাশ নিরাপত্তা দিয়ে ত্রাণের প্যাকেজ ও উদ্ধারের যাত্রী চলাচল হয়। বিশ্বব্যাপী সিরিয়া, সউদি আরব-ইউক্রেন সংঘাতে নানাভাবে এ রকম উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকট প্রেক্ষাপটে প্রয়োজনীয়তা: রাখাইন রাজ্যের পাল্লায় যুদ্ধ-বিগ্রহ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২৪–২৫ সালে সেখানে একটি শক্তিশালী দ্বন্দ্ব চলে যেখানে সেনা এবং বিদ্রোহী আক্রমণ অব্যাহত। জাতিসংঘের আশঙ্কা, রাখাইনে খাদ্য ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ধ্বংসপ্রাপ্ত এবং ঘাটতি রয়েছে en.prothomalo.com। এ ধরনের মানবিক সংকটে ত্রাণ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে নতুন করে রোহিঙ্গাদের পালিয়ে আসা শুরু হতে পারে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেশ মার্চ ২০২৫-এ ঢাকায় আসার সময় সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, ‘বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে মানবিক সহায়তা বহন করলে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের শর্ত তৈরি হতে পারে’thedailystar.net। সংকটকে টিকিয়ে রাখলে আরো লোকবাংলাদেশে ঢুকতে পারে, এটি বাংলাদেশের জন্য সম্বলহীন চাপ সৃষ্টি করবে। এজন্য যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন সূত্র মনে করে, বাংলাদেশ হয়ে সরাসরি রাখাইনে ত্রাণ পাঠানোর জন্য একটি মানবিক করিডোর প্রয়োজন।
মানবিক করিডোর: প্রস্তাবনা ও বাস্তবায়ন
২০২৫ সালের বসন্তে এই করিডোরের প্রস্তাবনা এসেছে আন্তর্জাতিক মঞ্চ থেকে। জাতিসংঘ মহাসচিব গুতেরেশ ঢাকায় আগমনের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনায় করিডোরের কথা ওঠে। এপ্রিল ২০২৫-এর মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশ সরকার সূত্রে জানা যায়, জাতিসংঘের অনুরোধে বাংলাদেশ “নীতিগতভাবে” (উইল ইন প্রিন্সিপল) রাখাইন রাজ্যে মানবিক করিডোর খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেen.prothomalo.com। পররাষ্ট্রমন্ত্রকের উপদেষ্টা এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। পরে পররাষ্ট্রমন্ত্রকের উপদেষ্টা মো: তৌহিদ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, করিডোর চালু করার বিষয়ে আমরা “নীতিগতভাবে রাজি, তবে কিছু শর্তাবলী রয়েছে”en.prothomalo.com। শরীফুল আলম (প্রধান সচিবের একান্ত সচিব) ফেসবুক বার্তায় জানান, রাখাইন রাজ্যের আর্থনীতিক বিপর্যয় মোকাবিলায় আমরা সহযোগিতা করতে রাজি, এবং যেহেতু বাংলাদেশ অতীতে ভূমিকম্পের পর মিয়ানমারকে সাহায্য করেছে, “আমরা মনে করি জাতিসংঘের সমর্থিত এই সহায়তা রাখাইনকে স্থিতিশীল করবে এবং রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করবে”thedailystar.net।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী করিডোর চলাচলে প্রথমে কিছু শর্ত রাখা হবে এবং জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে ত্রাণ পাঠাতে প্রস্তুতি নেয়া হবেen.prothomalo.comthedailystar.net। সরকারের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে বাংলাদেশ শুধু লজিস্টিক সহায়তা দেবে; সরাসরি ত্রাণ দিয়ে না। সবার অবগতির জন্য অবশ্য এই সিদ্ধান্তকে নির্বাচিত সংসদ থেকে গৃহীত করা উচিত বলে রাজনৈতিক নেতারা জোর দিয়েছেন।
মানবিক করিডোরের কার্যকারিতা ও চ্যালেঞ্জসমূহ
করিডোর বাস্তবায়নের মূল কার্যকারিতা হলো রাখাইনে গৃহবন্দি নিরস্ত্র নাগরিকদের কাছে খাদ্য, ওষুধ, চিকিৎসা সরবরাহ করা এবং সংকটমুক্ত পরিবেশে রোহিঙ্গাদের সুষ্ঠ প্রত্যাবাসনের পথ প্রশস্ত করা। এটির মাধ্যমে যাবতীয় মানবিক ত্রাণ সরাসরি সমস্যা অঞ্চলে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে, যা বিদ্যমান অচল পরিস্থিতি ভেঙে পরিবেশকে স্থিতিশীল করতে সহায়তা করবেthedailystar.net। বাংলাদেশের ভূমিকা থাকছে কেবল পথ (লজিস্টিক) সহায়তা, গন্তব্য ও ত্রাণপদার্থ সম্পর্কে সব সিদ্ধান্ত জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে হবেen.prothomalo.comthedailystar.net। এতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও সরাসরি করিডোরের মাধ্যমে ত্রাণ প্রদান করতে পারবে এবং উদ্ধার কাজে অংশ নিতে পারবে।
চ্যালেঞ্জ ও প্রতিবন্ধকতা: করিডোর চালু করার ক্ষেত্রে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা আছে। প্রথমে মিয়ানমারের উভয় পক্ষের সম্মতি দরকার – জানতে হবে কংগ্রেসমেন্ট (সেনা এবং বিদ্রোহী দুটোই) কে, কতদূর। নিরাপত্তার কারণেই এখানে ত্রাণবাহক কনভয়ের নিরাপত্তার প্রশ্নজিজ্ঞাসা হতে পারে। উল্লেখ্য রাখাইনে বিদ্রোহী ‘আরাকান আর্মি’ এবং জান্তা উভয়ই সক্রিয়, তাদের মধ্যে ঝামেলায় করিডোরকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হতে পারে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, রাখাইনের বিরোধী দলের সম্মতি ব্যতীত এই উদ্যোগ কার্যকর হবে না en.prothomalo.com। এছাড়া রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশে বিরোধীদলগুলোর উদ্বেগ আছে – বিএনপি মনে করে, দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা বিষয়ক ব্যাপারে সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়ে সংসদীয় দলগুলোর সাথে আলোচনা করা উচিতthedailystar.net। কিছু রাজনীতি এবং মিডিয়া এই করিডোরকে “কূটনৈতিক ফাঁদ” আখ্যা দিয়েছে, যার ফলে অভ্যন্তরীণ ঐক্যহীনতা বাড়তে পারে। এছাড়া করিডোরের মাধ্যমে অবৈধ অনুপ্রবেশ, সন্ত্রাসী কার্যকলাপের আশঙ্কা এবং ত্রাণ বিতরণে দূর্নীতি নিয়ন্ত্রণের প্রতিকূলতাও রয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, মিয়ানমার সরকার করিডোর চালু হতে দেবে কিনা – প্রচলিত সংবাদ অনুযায়ী মিয়ানমার জান্তা প্রাথমিকভাবে এতে অনীহা দেখিয়েছে। অতএব করিডোরের বাস্তবায়নে রাষ্ট্রীয় সম্মতি এবং আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধান ছাড়া সবকিছু বাধাপ্রাপ্ত হতে পারেen.prothomalo.comthedailystar.net।
বেশ কয়েকটি দেশে অনুপ্রবেশ, নিরাপত্তাহীনতার ইতিহাস বিবেচনায়, বাংলাদেশকেও সুরক্ষা ঝুঁকি নিয়ে বিবেচনা করতে হচ্ছে। এই সব কারণেই করিডোর নিয়ে ব্যাপক আলোচনার পরও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে কিছু সময় লাগতে পারে।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও মানবিক ভূমিকা
বাংলাদেশ এ সংকট মোকাবিলায় কূটনৈতিক ও মানবিক দুই ভূমিকাতেই নিবেদিত। কূটনৈতিকভাবে, বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার পুনর্লাভ এবং নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ওআইসি, সাধারণ অধিবেশন ইত্যাদিতে অবিরাম চাপে যুক্ত হয়েছে। ২০১৭ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিয়ানমারকে একটি প্রাথমিক চুক্তি (MOU) স্বাক্ষর করিয়েছিলেন, যাতে রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের একটি রোডম্যাপ থাকা কথা ছিলtheguardian.com। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলি বিশ্লেষণ করেছিল ২০১৭-এর আগস্টের পর “৬২০,০০০ জনেরও অধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে” এবং যুক্তরাষ্ট্র তা “জাতি সাফাই” বলে চিহ্নিত করেছিলtheguardian.com। বাংলাদেশ এসব সহিংসতার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার (আইসিজি, আসামি গাম্বিয়া) প্রক্রিয়ায় নিজেকে জড়িয়েছে।
মানবিকভাবে, বাংলাদেশ সরকার জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ে শিবির ব্যবস্থাপনা করছেunhcr.orgdata.unhcr.org। ৩৩টি শিবির স্থাপনের পাশাপাশি ভাশান চরে প্রায় ৩৫,০০০ রোহিঙ্গাকে পুনর্বাসনের প্রকল্প হাতে নিয়েছেdata.unhcr.org। কক্সবাজারে স্থানীয় সুবিধা যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা শিল্পেও সরকারের অবদান রয়েছে এবং পুলিশ প্রশাসন রোহিঙ্গা ত্রাণ বিতরণে সহায়তা করছে। এছাড়া বাংলাদেশ হোস্ট কমিউনিটির ক্ষতিপূরণের জন্যও উদ্যোগ নিয়েছে, যেমন ২০১৭ সালে ক্যাম্প এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা নির্মাণ, স্বাস্থ্য সুবিধা সম্প্রসারণ ইত্যাদি।
অর্থনৈতিকভাবে, বাংলাদেশ নানা দাতা সম্মেলন আয়োজন করে রোহিঙ্গাদের সহায়তার তহবিল জোগাড়ে চেষ্টা করছে। ২০২৫ সালের মার্চে জেনেভায় UNHCR ও IOM যৌথ প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে যে, “বাজে অর্থায়ন ও বিশ্ব জুড়ে অন্যান্য সংকটের কারণে রোহিঙ্গারা এখন “নিরাপত্তাহীন অবস্থায়, সম্পূর্ণরূপে মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল”unhcr.org। বাংলাদেশ সরকার এই আহ্বান সমর্থন করেছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও সাহায্য দেওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি ঢাকা মানছে যে জাতিসংঘের নেতৃত্বাধীন যে কোনও মূলধারার সহায়তা কর্মসূচিতে লজিস্টিক সহায়তা দেওয়া হবেirrawaddy.comthedailystar.net।
সার্বিকভাবে, বাংলাদেশ দেখিয়েছে দীর্ঘমেয়াদী দায়িত্বশীলতা – এখন পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের জন্য কোনো আবাসস্থল সীমা আরোপ করা হয়নি এবং সকলের জন্য চিকিৎসা, শিক্ষা, আইনী সহায়তা চালু রয়েছে। তবে দেশের নিজস্ব সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় দূর্ভাবনাও করেছে: অন্তত স্থানীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে কয়েকবার রোহিঙ্গাদের বহির্বিশ্বে পুনর্বাসনের প্রস্তাব দিয়েছে। নতুন উদ্ভাবনী সমাধান যেমন ভূমধ্যসাগর মহাসাগরীয় করিডোরের মতো ধারনা আলোচনা হচ্ছে, যদিও এখনও তা নীতি পর্যায়ে।
উপসংহার
রোহিঙ্গা সংকট এখনো মিথ্যার সীমানা অতিক্রম করেছে এবং এটি কেবল বাংলাদেশের নয়, আন্তর্জাতিক সমাজের একটি পরীক্ষাও বটে। এই সংকটের মধ্যে মানবিক করিডোর–এর ধারণাটি তুলনামূলকভাবে নতুন, যা রাখাইন রাজ্যে দারিদ্র্যতা ও যুদ্ধজনিত বিপর্যয় মোকাবিলায় মানবিক সহায়তা দ্রুত পৌঁছাতে পারে। বাংলাদেশ এই প্রস্তাবনাকে নীতিগতভাবে সমর্থন দিয়েছে, তবে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সম্মতি, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং অভ্যন্তরীণ ঐক্যের জন্য দেশাত্মবোধক সমঝোতা ছাড়া এর বাস্তবায়ন কঠিন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বাংলাদেশের এই সঙ্কটে সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে, যেন রোহিঙ্গারা আস্থাভাজন প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নিরাপদে তাদের ঘরবাড়িতে ফিরে যেতে পারে। অন্যদিকে বাংলাদেশের মানবিক দায়িত্ব ও সার্বভৌমত্বের সুরক্ষায় নীতিগত সচেতনতা বজায় রাখাই আসল চ্যালেঞ্জ।
তথ্যসূত্র: রোহিঙ্গা সংকট ও মানবিক সহায়তা বিষয়ে সম্মুখভাগের গবেষণাপত্র, জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলির উপর ভিত্তি করে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছেunhcr.orgthenewhumanitarian.orgunhcr.orgaljazeera.comen.prothomalo.comthedailystar.netthedailystar.netthedailystar.net।
0 Comments